মোহাম্মদ আলম : ‘‘আমি একজন আরব, আমি গোত্রপরিচয়হীন, আমি রোগাক্রান্ত এমন একটি দেশে, যেখানে সবকিছু বাঁচে ক্রোধের ঘূর্নিস্রোতে।’’
ফিলিস্তিনি নোবেল লরিয়েট কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা। স্বাধীনতা কি ? একজন পরাধীন মানুষ সব থেকে বেশী উপলব্দী করে। মাহমুদ দারবিশের কবিতায় আমৃত্যু কেবল উদগ্র স্বাধীনতার আকাঙ্খা ঝড়েছে। তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তিনি বিশ্বের দরবারে ছুটে বেড়িয়েছেন নিজের এবং স্বজাতির স্বাধীনতার দাবিতে। তিনি দিনের পর দিন, যুগ যুগ লিখনির মাধ্যমে বিশ্ব বিবেককে শুনিয়েছেন মনোকষ্টের কথা। পরাধীনতার গ্লানি হৃদয়ে পুষেই তিনি গত হলেন। এখন তার সন্তান স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত। ‘‘আমি শুধাই; ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়গণ, এ-কথা কি সত্য যে মানুষের এই মাটির পৃথিবী, সব মানুষেরই জন্য ? কবির এই প্রশ্নের উত্তর অধরা। আমি স্বাধীন। আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে যুদ্ধ করেছেন। আমি গর্বিত। স্বাধীন বাংলাদেশ আমার ঠিকানা।
স্বাধীনতার কথা মুক্তিযোদ্ধার জবানীতেই ভাল শুনায়। আমার পিতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী। তিনিও গত হয়েছেন। কিন্তু তিনি আমাকে দিয়েছেন স্বাধীনতা। আমি তার মুখ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা শুনতে শুনতে বেড়ে উঠেছি। তার মুখ থেকেই আমি অনেকবার শুনতে চাইতাম কিভাবে তিনি শহীদ ফাদার উইলিয়াম ইভন্সের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। তিনি আবেগ জড়িত কন্ঠে বলতেন, ‘‘পাক হানাদার বাহিনী ফাদারকে গুলি করে হত্যা করে। লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। চারদিকে ছড়িয়ে পরে সেই খবর। তিনিও তা জনতেন। দুইদিন পর নদীর কয়েক মাইল ভাটিতে বাহ্রা ঘাটে ভেসে উঠে লাশ। খবর পেয়ে তিনি ও ময়নাল নামে তার বন্ধু দেখতে যান। তখন এই খবর দশ বারো মাইল দূরবর্তী গোল্লা চার্চে জানানোর সাহস কারো হচ্ছিল না। তারা দুই বন্ধু জীবনের ঝুকি নিয়ে পায় হেটে বিকেলে গোল্লা গীর্জায় ফাদারের মরদেহ পাওয়ার খবর দেন। তখন গীর্জা থেকে আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে সেইদিন রাতে ফাদারের মরদেহ উদ্ধার করে গীর্জায় আনেন।’’ আমি গোল্লা গীর্জার রেকর্ড বইয়ে নিজ চোখেও দেখেছি সেদিনের ঘটনার বর্ণনা। আমি আবেগে আপ্লুত হয়েছি। আমার পিতাকে নিয়ে গর্ব হয়েছে। তারপর আমার পিতা ভারতে এক মাসের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি যুদ্ধ করেছেন। আমাকে আরো শুনিয়েছেন, পাকিস্তানিরা কি আচরণ করেছে। আমার পিতার জন্য আমি গর্ববোধ করি। আমি প্রার্থনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে পিতার জন্য বিশেষভাবে আবেদন করি। তিনি যেন পরলোকে উত্তম পুরস্কার লাভ করেন।
কবির কবিতায়ও স্বাধীনতার মর্মার্থ উপলব্দি সহজ । আর যারা কবি এবং মুক্তিযোদ্ধা। সেইসব মুক্তিযোদ্ধা কবিতার মাধ্যমে স্বাধীনতাকে জীবন্ত জীবাস্মের মত রুপ দিয়েছেন।
কবি রফিক আজাদ যুদ্ধ করেছেন। কবিতায় ঘোষণা করেছেন স্বাধীনতার কথা। ‘‘নেবে স্বাধীনতা? -নাও তোমাকে দিলাম সবুজ সংকেতময় নীল পাসপোর্ট- সুনিশ্চিত স্বাধীনতা, নেবে স্বাধীনতা? -নাও তোমার দু হাতে তুলে দিচ্ছি পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের ভিতরে যা- কিছু- জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে-সবকিছু তোমার, তোমার।’’
আত্মবিশ্বাস! গর্ব ! এবং একজন স্বাধীন মানুষের তৃপ্ত হৃদয়ের কথা। আমার স্বাধীনতার জন্য এইসব বীর মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে আমি চিরঋণী। আমি উপলব্ধি করি আরো বেশী বেশী স্বাধীনতার কথা শুনতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে শুনতে হবে। স্বাধীনতার কবিতায় জানতে হবে। যতবেশী শুনবো যতবেশী জানবো। আমার দেশপ্রেম সমৃদ্ধ হবে। আমি বুঝবো আমার স্বাধীনতার মূল্য। দেখুন আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলছি-
‘‘আমি স্বাধীন।
আমি চিৎকার করি।
আমি হাসি।
আমি দিগ¦বিদীক ছুটে বেড়াই।
আমিই আমার নিজের আঙুল তুলি।
আমি মুক্ত মনে ভাবি।
আমি নিরুদ্বিগ্নভাবে লিখি।
নিজের ইচ্ছায় শশ্রু পরিপাটি করতে পারি।
আমার পরিচয় বাংলাদেশী।’’
এই যে আমি আমার স্বাধীনতার কথা বলছি। বঙ্গবন্ধুর জন্য। আমার পিতার জন্য। মুক্তিযুদ্ধাদের জন্য। আপনাদের সহস্র সালাম।