×

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা


নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী অপশক্তি এবং ‘নব্য রাজাকারদের’ প্রতিরোধের আহ্বানের মধ্য দিয়ে সোমবার সারাদেশে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়েছে। দেশমাতৃকার মুক্তির যুদ্ধে শহীদ জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছে সারাদেশের মানুষ।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়েছে কিছুটা সীমিত পরিসরে। সবখানেই ছিল স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার তাগিদ। এর পরও শোকে আপ্লুত হাজারো মানুষ বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মর্মন্তুদ যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিস্তম্ভে নিবেদন করেছেন প্রাণের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

এদিন সূর্যোদয়ের ক্ষণে দেশের সর্বত্র জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার পাশাপাশি শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উত্তোলন করা হয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন পতাকা উত্তোলন, শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ সব টিভি ও রেডিও চ্যানেল দিনভর বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করেছে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করে।

দিনটি উপলক্ষে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম শামিম উজ জামান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল সামরিক কায়দায় সালাম জানায়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের পক্ষ থেকে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারাও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে জাতির মেধাবী সন্তানদের স্মরণ করেন। মন্ত্রিসভা এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুুল মোমেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, শাজাহান খান, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, এসএম কামাল হোসেন, মির্জা আজম, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, সংস্কৃৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, শাহাবুদ্দিন ফরাজী, আনিসুর রহমান, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম প্রমুখ।

শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বিষবৃক্ষের ডালপালা এখনও বিস্তার করে আছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই অপশক্তিকে সমূলে উৎপাটন করাই হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের শপথ। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বিএনপি সকালে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল প্রমুখ।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৭১ সালে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে, তারা চেয়েছিল এদেশকে অকার্যকর করতে। আজ গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করা হয়েছে। জনগণের মতপ্রকাশ এবং মুক্তচেতনার স্বাধীনতাও নেই। সে পরিস্থিতি থেকে জনগণকে উদ্ধার করে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই আজকের দিনের অঙ্গীকার।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নেতৃত্বে দলটির নেতারা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সল চিশতী, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, আলমগীর সিকদার লোটন, ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা আল মাহমুদ, সুলতান আহমেদ সেলিম, আমানত হোসেন আমানত প্রমুখ।

পরে দেশজুড়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ ভাস্কর্যের অবমাননা ও ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে গোলাম মোহাম্মদ কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা; আবার সমন্বিত ষড়যন্ত্রের ফসলও হতে পারে। কোনো ষড়যন্ত্র থাকলে সেটা বের করে সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। দেশের মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি পালন করেই একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চায়। গুটিকয়েক মানুষ, যারা বাঙালি সংস্কৃতির বাইরে রয়েছেন, তারা কখনোই দেশের নীতিনির্ধারক হতে পারেন না।

মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধভূমি স্মৃতিসৌধে আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছে ১৪ দল, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ জাসদ, ন্যাপ, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্কসবাদী), জেএসডি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), যুব মৈত্রী, ছাত্র মৈত্রী, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ‘৭১, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, মহিলা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামসহ (বোয়াফ) বিভিন্ন দল ও সংগঠন। সর্বস্তরের মানুষের অশেষ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অর্ঘ্যে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির মিনার।

# জাহো/ট (আপ)