×

প্রকৃতি এবং সমাজে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে

মোহাম্মদ আলম : প্রথমে ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়ার ৯ থানা, নারায়ণগঞ্জের ৭টি, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, চট্রগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্ট তারপর একে একে ডিএমপির মতিঝিল এবং ওয়ারি জোনে থানায় থানায় নিরাপত্তা জোড়দার করা হয়েছে। থানার সামনে বালুর বস্তার বাঙ্কারে এলএমজি ও চাইনিজ রাফেল সজ্জিত পাহাড়াদার। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোষ্ট। তাছাড়া সারাদেশে পুলিশ প্রশাসনকে বিশেষ সর্তক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে নিরাপত্তা নিয়ে সরকার বিশেষ চাপে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক উগ্রবাদি সহিংসতার ঘটনায় সরকার উদ্বিগ্ন। থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়া ও জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, ভূমি অফিস এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশের হাত থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন।

এসব ঘটনা কঠোরভাবে দমনে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, রাবার বুলেটে সহিংসতা দমানো না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র চালাতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে মনোবল শক্ত রাখারও তাগিদ দেন তিনি। পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে দেশের সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), মহানগর পুলিশের উপকমিশনার, জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি), পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এসব ঘটনায় স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে সরকার ও প্রশাসন নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ উদ্বিঘ্ন। বৃহৎ প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর এবং হেফাজত নেতা মামুনুল হক ইস্যুতে ওইসব স্থানে জ¦ালাও পোড়াও তান্ডব চালানো হয়েছে। শুধু তাই নয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভার্স্কয্য ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

হেফাজতে ইসলাম বার বারই বলছে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে হেফাজতের কর্মী সমর্থকরা জড়িত না। অপরদিকে হেফাজত নেতাদের ভাষ্যে গুলিতে তাদের ২৩ জন কর্মী শহীদ হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম নেতৃবৃন্দের কথা স্পষ্টতই বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক বুলির আভাস। দেরিতে হলেও সরকার নড়েচড়ে বসেছে।

সরকারের এই নড়েচড়ে বাসা কি দেড়ি হয়ে গেছে। ইতমধ্যেই হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামীসহ ৫ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের জন্য খোঁজা হচ্ছে মামুনুল হককে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির জুনাইদ বাবুনগরী শান্তিপূর্ণ দূর্বার আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন। সামনের দিনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সফলভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি তথা ১৪ দলীয় জোটকে মোকাবেলা করেছে। পুলিশ প্রশাসন বরাবরই সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। আওয়ামী লীগ বা সহযোগী অংগ সংগঠনকে হেফাজতের মুখোমুখি দেখা যায়নি। বরাবরই সরকারের দমন পিড়নের হাতিয়র বানানো হয় পুলিশকে। হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতৃবৃন্দের কথাতে রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বপ্নের ঝিলিক দেখা যায়। তাই হেফাজতে ইসলাম সরকারের নতুন প্রতিপক্ষ। অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যাচ্ছে পুলিশ হেফাজতে ইসলামের টার্গেট। পুলিশকে লক্ষ্য করেই হামলা ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে।

সারাদেশে হেফাজত নেতৃবৃন্দের নামে মামলা এবং ধরপাকড়ের মাধ্যমে হেফাজতকে রাজনীতির মাঠে নামার সুযোগ করে দিবে কোন সন্দেহ নেই। বিএনপি বা ১৪ দলীয় জোটকে যে কায়দায় দমিয়ে রাখা গেছে। বিলাসী জীবনজাপনে অভ্যস্ত বুর্জুয়াদের দল ১৪ দলীয় জোট। লাঠির ঠেঙানি বা কারাগারের ভয় ওই বুর্জুয়া রাজনীতিবিদদের মনে ভিতি সৃষ্টি করে। তার চাইতে অঢেল সম্পদ বা বিদেশে গচ্ছিত অঢেল অর্থে বিলাসী জীবনযাপনই তাদের কাছে শ্রেয়। হেফাজতে ইসলামের বেলায় কি ঘটে এটাই দেখার বিষয়। হেফাজতে ইসলামে নেতাকর্মীরা আর যাই হোক বুর্জুয়া বিএনপি বা তাদের সরিক দলের মত না। হেফাজতের নেতৃবৃন্দ মাদ্রাসার কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় বেড়ে উঠা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দীর্ঘ ক্ষমতার স্বাদ নিয়ে ইতমধ্যেই অঢেল সম্পদ অর্জন করেছে। তাদের গাড়ি বাড়ি সমেত বিলাসী জীবন চোখে পাড়ার মত। তাই সেই বিলাসী জীবন ছেড়ে হেফাজতের ভুখা নাঙাদের মুকাবেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ মাঠে কতদিন আসবে এটাও দেখার বিষয়। দিনশেষে পুলিশই শেষ ভরসা।

বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি’র উত্থাণ পর্ব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কংগ্রেস আর বিজেপির তফাত হচ্ছে বিজেপির নেতৃবৃন্দ সোনার চামচ মুখে জন্মেনি। চা বিক্রেতা নরেন্দ্র মোদি। দিন দিন বেশ ভালভাবেই ভারতের দরিদ্রপিড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে নিজেকে মেলে ধরেছেন। মোদির নিজস্ব ধ্যানধারণা বা সংগ্রামী জীবন ওইসব দরীদ্র মানুষের স্বপ্নের লক্ষ্য। গণতান্ত্রিক ভারতে বুর্জুয়া শ্রেনীর জনবিমুখতা কর্মকান্ড ধর্মান্ধ বিজেপিকে ক্ষমতায় বসতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশও কি সেই দিকে যাচ্ছে! আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মাঝে আত্মম্ভরিতা এবং আত্মবিশ^াস ভর করেছে। তাছাড়া ইতিহাসের পরিক্রমা এটাই সাক্ষ্য বহন করে কেহই চিরস্থায়ী নয়। প্রকৃতির খেয়াল হচ্ছে সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নেয়া। আওয়ামী লীগের বড় শক্তির যায়গা বঙ্গবন্ধু পরিবার তথা তার সুযোগ্য উত্তরসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের অংশিদার নিঃশেষিত বিরোধী দল, ক্ষয়িঞ্চু বিএনপি এবং মিশ্র সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠি তাদের যোগ্য উত্তরসূরী নির্বাচনে ব্যর্থ। তাহলে কোন শ্রেনী আওয়ামী লীগের তালে তালে এগিয়ে যাবে ? অথবা পরিবর্তিত সমাজে নেতৃত্বে কারা টিকে থাকবে। এর উত্তর জানতে আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে আমাদের ।

মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে হেদায়েতের জন্য নবী রাসুলগণকে প্রেরণ করেছেন। তাছাড়া আসমানি বালা মুছিবত দিয়েও মানব জাতিকে সর্তক করা হয়। মানব জাতিকে বিভিন্ন পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে এগিয়ে আনা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নুহ (আঃ) এর সময়ে মহাপ্লাবনের মুছিবতে ফেলে মানব জাতির প্রতিনিধি টিকিয়ে রাখা হয়েছিলো একটি মাত্র নৌকায় চড়িয়ে। ফেরাউনের নীল নদে নিমজ্জিত হওয়া বা সামুদ জাতির উপর অগ্নিবর্ষন সবই আসমানী বালা। ১৪ শত বছর পূর্বে শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সরাসরি প্রতিনিধির মাধ্যমে হেদায়েতের বিধান সমাপ্ত। তবে আসমানি বালা মুছিবত থেমে নেই। সারা বিশ^ করোনা ভাইরাস নামে মহামারিতে বিপর্যস্ত। প্রথমে মনে হয়েছিলো প্রতিষেধক টিকা আবিস্কারের মাধ্যমে এই মুছিবত দুর হবে। টিকা আবিস্কার হলেও তা এই মুছিবত সমুলে নির্মুল করতে যথেষ্ট না। হয়ত মানুষের জ্ঞনের মাধ্যমেই এই মুছিবতের অবসান হবে। তবে সহসাই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না।

বিশে^র উন্নত দেশগুলোই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বেশি বিপর্যস্ত। যেহেতু উন্নত দেশের মানুষই ভোক্তা। যে কারনে উৎপাদনমুখি ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের মত দেশগুলোর উভয় সংকট। উন্নত দেশের সরকার লকডাউনে রেখে তাদের নাগরিকদের নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। দরিদ্রপিড়িত দেশগুলোতে সরকারের সেই সামর্থ নেই। বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারি চাকুরীজীবিরা এই সুবিধা ভোগ করছেন। মাস শেষে প্রয়োজনীয় বেতন ভাতা তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা পরে। বেসরকারি চাকুরে বা অন্যদের সেই সুবিধা নেই। আর জনগোষ্ঠির সিংহভাগই এই শ্রেনীর। তাই লকডাউন কার্যকর করা বাংলাদেশে কঠিন। দেশের খেটে খাওয়া বৃহৎ জনগোষ্ঠির পেটের ক্ষুধা মিটে দিনাদিনি কাজের মাধ্যমে। করোনা কালের দীর্ঘ কর্মহীনতায় এই পরিস্থিতি আরো প্রকট করেছে। যে কারনে করোনা প্রতিরোধে লকডাউন তার কাছে নেহাৎ পরিহাস বৈ কিছু না। আর সরকারি চাকুরীজিবী ছাড়া বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানী নির্ভর। উন্নত দেশে লকডাউনের কারনে সেখানে রপ্তানি সীমিত। কারখানা মালিকদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি, ক্রয়াদেশের চার ভাগের একভাগ নেয়া হচ্ছে। বাকি পণ্য কবে কখন যাবে তা অনিশ্চিত। যে কারনে লাকডাউনের মাঝেও রপ্তানীমুখি শিল্প কারখানা খোলা থাকছে। রপ্তানীর মাধ্যমে অর্থনীতি স্বাভাবিক থাকবে সেই নিশ্চয়তাও সীমিত। এটাই বাস্তবতা।

সবকিছু পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতির মাধ্যমে তার খেয়াল মানুষের সমাজে প্রয়োগ করেছে। দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোভিড-১৯ ভাইরাস। আক্রান্ত মানব সমাজে মৃত্যুর মিছিল। এখনো কেউ জানে না কোথায় থামবে এই মরন ছোবল।

আমরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন কামনা করি। এভাবে মৃত্যুর মিছিল নিয়ে পরিবর্তন কি এই মানব সমাজ প্রত্যাসা করেছিলো। মানুষ তার লেলিহান লোভ এবং প্রতিহিংসার বর্শবর্তি হয়ে কেবল সীমাহীন উন্নতির লক্ষ্যে ছুটছে। ক্ষমতাবান তার নিজের চরিতার্থ সিদ্ধি করতে অপেক্ষকৃত দূর্বল ও নিরপদ্রুপ প্রকৃতিকে ধ্বংশ করতেও দ্বিধা করেনি। আর সেই ধ্বংশের লেলিহান ছোবল এখন তারই অস্থিমজ্জায় সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে উপস্থিত। ইতিহাস, প্রকৃতি, ধর্ম বা মনিষী বচন সব মতামতেই পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বিশ^ মানবতা এবং প্রকৃতিতে পরিবর্তন প্রকৃয়া চলছে।

১৩/০৪/২০২১