নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর আজ রোববার থেকে সরব হচ্ছে স্কুল আঙিনা। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে ক্লাসে। করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুরক্ষা বিবেচনায় কয়েক দফায় ছুটি বাড়ানো হয়। গতকাল শনিবার এই ছুটি শেষ হয়েছে। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন- আজ থেকে খুলবে সব স্কুল-কলেজ। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসের রুটিন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)।
এ দিকে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর করোনা সংক্রমণ যদি বাড়ে তাহলে পুনরায় বন্ধ করে দেয়া হবে। তিনি আরো জানান, দীর্ঘ ১৭ মাস পর আজ থেকে খোলা হচ্ছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাঠদান করলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা কম। তারপরও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফের বন্ধ করে দেয়া হবে।
অবশ্য স্কুল-কলেজ খোলার আগেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য ১১ দফার একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালনের জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। একই সাথে গত শুক্রবার মাউশি স্কুলে শিক্ষার্থীদের টিফিন না দেয়ার নির্দেশনা জারি করেছে। মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো: গোলাম ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে টিফিন নিতে বা খেতে পারবে না। তাদের বাড়ি থেকেই টিফিন খেয়ে আসতে হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা দু’টি বা তিনটি ক্লাস করতে স্কুলে আসবে তাই তাদেরকে স্কুলে টিফিন আনার কোনো প্রয়োজন হবে না।
যদিও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পক্ষ থেকে আগেই দেয়া হয়েছে ১১ দফা নির্দেশনা। এসব নির্দেশনা মেনেই ক্লাসে ফিরতে হবে শিক্ষার্থীদের। ইতোমধ্যে দীর্ঘ দিন পর শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারবে, এ জন্য তাদের মধ্যে বইছে খুশির আমেজ। প্রতিটি স্কুলের আঙিনা ও ক্লাসের ভেতর-বাইরেও ঝাড়ামোছা দিয়ে করা হয়েছে পরিষ্কার। স্কুল ভবনের আশপাশেও ছেটানো হয়েছে জীবাণুনাশক। ব্যবহার করা হচ্ছে ব্লিচিং পাউডার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রাথমিক স্কুলগুলো কিভাবে চলবে এ-সংক্রান্ত ১৬ দফা নির্দেশনা প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। গত শুক্রবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ এক. দৈনিক সমাবেশ বন্ধ থাকবে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ দূরত্ব রেখে নিজেদের আসনে বসে হালকা শারীরিক কসরৎ (পিটি) করবে। কেউ প্রয়োজন মনে করলে পিটি করা থেকে বিরত থাকতে পারবে। দুই. শিক্ষার্থীরা জিগজ্যাগ তথা জেড বিন্যাসে বসবে। প্রতি বেঞ্চে একজনের বেশি বসবে না। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে একই শ্রেণীকে একাধিক গ্রুপে ভাগ করে একাধিক কক্ষ ও শিক্ষকের সহায়তায় পাঠদান চালাতে হবে।
তিন. পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
চার. পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকার্যক্রম সপ্তাহের ছয় দিন চলবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অন্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন আসবে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি দেয়া নির্দেশনায় মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো: গোলাম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল খাবার পানি সরবরাহ করবে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রবেশের সময় ভিড় এড়িয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে মাউশি ডিজি আরো বলেন, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বা করোনার উপসর্গ থাকলে তাকে যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো না হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়গুলো নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষককে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতির বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের ৯৫ শতাংশই টিকা নিয়েছেন। তবে কর্মচারীরা কিছুটা পিছিয়ে আছেন। তাদের টিকা নেয়ার হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের ৯০ শতাংশই টিকা নিয়েছেন। স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা দেয়ার পর বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষক-কর্মচারীদের টিকা নেয়ার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এমনকি টিকা না নেয়াদের বেশির ভাগ এরই মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। তবে টিকা নেয়ার এসএমএস না আসায় অনেকেই টিকা নিতে পারছেন না। কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ টিকা না নেয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের স্কুলে আসতে নিষেধ করেছে। অবশ্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক।
এ দিকে বন্যার কারণে অনেক জেলাতেই স্কুল খোলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কেননা সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীতে বিলীন হয়েছে অনেক স্কুল। হাজার হাজার স্কুল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এখনো বন্যার ক্ষত অনেক স্কুলে। সব মিলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি জেলার মধ্যে কুড়িগ্রামে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়েছে। ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের কবলে। মাদারীপুরে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চলের প্রায় অর্ধশত বিদ্যালয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ঢোকায় ক্লাস শুরু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
