মোহাম্মদ আলম : ‘কিরণ’ অর্থ যেমন আলো, কাজে-কর্মেও আলো ছড়িয়েছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ। রাজনীতিবিদ, সচেতন জনসাধারণ এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আলোচনায় এমনটিই মনে হয়েছে।
এ কথা সবারই জানা ২০১৩-১৮ মেয়াদে প্রথমবার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ২৭ মাস সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের কারণে পুনরায় ২০১৮-২৩ মেয়াদেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মত তার উপর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
আসাদুর রহমান কিরণ ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে পরিস্কারভাবে আওয়ামী লীগের পারপাস সঠিকভাবে সার্ভ করতে পেরেছেন। কারণ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে যারা জাহাঙ্গীর আলমের ব্যপারে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে বড় মুখ করে কথা বলেছেন, দলীয় মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর জাহাঙ্গীর আলম জাতির পিতাকে নিয়ে কটুক্তি করার অপরাধে দল থেকে বহিস্কার হন(বর্তমানে ক্ষমাপ্রাপ্ত)। এতে ওইসব নেতৃবৃন্দ চরমভাবে বিব্রত ছিলেন। পরবর্তি সময়ে মেয়র পদ থেকে জাহাঙ্গীর সাময়িক বরখাস্ত ও কিরণ ভারপ্রাপ্ত মেয়র হন। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কিরণের প্রধান কাজই ছিলো দলের ভাবমুর্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে গাজীপুর সিটি মেয়র পদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার। সম্ভবত তিনি কাজটি বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন। যে কারণে জাহাঙ্গীর আলম শর্ত সাপেক্ষে আওয়ামী লীগের ক্ষমা পেলেও মেয়র পদে আর ফিরতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবে পরবর্তি ২৫ মের নির্বাচনে কিরণ প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন।
এ বিষয়ে একজন সিনিয়র নারী সাংবাদিকের মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি একটি প্রাইভেট টেলিভিশনে রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে নিয়মিত টক শো পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে কাজ করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমাদৃত। তার ভাষ্য, ‘কিরণ সাহেবের সাথে একদিনই কথা বলে মনে হয়েছে, আসাদুর রহমান কিরণ দীর্ঘ রেসের ঘোড়া।’ তিনি মনে করেন, জাহাঙ্গীর আলম যেভাবে প্রতিদ্বন্দী রাজনীতিবিদদের বিষোদগার করতে গিয়ে প্রকারান্তরে নিজ দলের বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিরণ রাজনীতিক হিসেবে তেমন হালকা মেজাজের না। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কিরণ আলোচনায় আছেন বলে তিনি মনে করেন।
কিরণ একদিকে যেমন দক্ষতার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও সরকারের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করেছেন। অপরদিকে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ খ্যাত গাজীপুর আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠায় অনেকটাই সমণ্বয়কের ভুমিকা রেখেছেন।
বর্তমান রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের দ্বিমুখি ভুমিকা রয়েছে। কারণ ব্যবসার পাশাপাশি অনেকেই কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। গাজীপুর মহানগর শিল্পকারখানা অধ্যুষিত এবং পর্যটন এলাকা। দেশ বিদেশের বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠির কারখানা গাজীপুর মহানগর এলাকায় আছে। গাজীপুর সিটিতে কেমন মেয়র হওয়া উচিত এ ব্যপারে ব্যবসায়ীরও চাওয়া পাওয়া বিষয় আছে। একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের একটাই চাওয়া ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ, সহজ ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে যেন জটিলতা না থাকে। কিন্তু তাদের অভিযোগ ২০১৮ সালের পর এসব নিয়ে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তাদের অনেক দেন দরবার করতে হয়েছে। পরবর্তি সময়ে এফবিসিসিআই এর হস্তক্ষেপে বিষয়টি সুরাহা হয়। তারা এটাও স্বীকার করেছেন, আসাদুর রহমান কিরণ ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয় নিয়ে কোন প্রকার ঝামেলা হয়নি। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং সহজ শর্তে হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। ব্যবসায়ীদের কথা একটাই গাজীপুরের মেয়রকে হতে হবে ব্যবসা বান্ধব। একজন মেয়রের ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা থাকলে তা বাড়তি সুবিধা। সরাসরি মতামত না দিলেও তাদের কথা বার্তায় বুঝা যায় আসাদুর রহমান কিরণের মত একজন মেয়র তাদের প্রত্যাশা।
গাজীপুর সিটি আয়তন বা জনসংখ্যা বৃহত। তাই প্রার্থীর আর্থিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিক থেকে কিরণের অবস্থা সুবিধাজনক। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে তার সম্পর্কে সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা গেছে তিনি(কিরণ) শত শত কোটি টাকার মালিক। এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে তিনি আর্থিকভাবে বেশ সচ্ছল।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি কিরণ। মেয়র প্রার্থীতার কথা বাদ দিলে গাজীপুর মহানগরে সিনিয়র রাজনীতিবিদদের কাছে আসাদুর রহমান কিরণ অত্যন্ত স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। একদিকে তিনি যেমন সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের সম্মান করেন। অপরদিকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ি হিসেবে দলের যে কোন প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়ান। গাজীপুর ২ আসনের সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেলের অত্যন্ত আস্থাভাজন তিনি। একইসাথে বর্ষিয়ান নেতা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক নেতা হিসেবে কিরণকে স্নেহ করেন। আর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের সাথে দীর্ঘ দিন টঙ্গী পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ২০২৩ সালের প্রার্থী মনোনয়নে নিজ যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। এদিক থেকে বলা যায় কিরণ অনেকটাই এগিয়ে।
পর পর ৫ বারের কাউন্সিলর এবং ২ বার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কিরণের দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা তাকে ২০২৩ সালের মেয়র প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রেখেছে। গাজীপুর সিটির দুই দুইবার ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগ তথা সভাপতি শেখ হাসিনা কিরণের উপর আস্থা রেখেছে। যে কারণে ২০২৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসাদুর রহমান কিরণ এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
লেখক: সাংবাদিক, হেড অব অনলাইন, আমাদের সময়।
২০১৮ সালের গাজীপুর সিটি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের মিডিয়া উইং হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
