×

‘বিজয়ী’ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা

মোহাম্মদ আলম : ২০২০ সাল বিশ্ববাসিকে করোনা মহামারিতে পর্যুদস্ত রেখেছে। করোনা আরো একজনকে বিপাকে ফেলেছে। যুক্তরাস্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। ট্রাম্প তার মেয়াদে অনেক কিছুতেই জনসাধারণের বিরাগভাজন হয়েছেন। তবে সব থেকে দগদগে ক্ষত হচ্ছে। করোনায় দুই লক্ষাধীক আমেরিকানের প্রাণহানী। এর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। করোনা নিয়ে পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্টের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যভাব প্রকৃতিও হয়ত ভালভাবে নেয়নি। যেকারনে নির্বাচন চলাকালীন দেখা গেলো সেই প্ররাক্রমশালী ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত। মুখে মাস্ক, শয্যাশায়ী শেষে হাসপাতালের স্মরাণাপন্নও হলেন।এখন তার বিদায় ঘন্টা বেজেছে। তিনি যতই হম্বিতম্বি করছেন ততই তেতে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, নিরাপত্তা এবং খোদ রিপাবলিকানরাও বাস্তবতা মেনে নেয়ার পক্ষে বলছেন। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা বলেই দিয়েছেন পরাজিত হলে ক্ষমতা হস্তন্তরে কোন সমস্যা হবে না। এটাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

৩ নভেম্বর নির্বাচনের দিন ট্রাম্প অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। সব ভোট গণনা শেষ না হতেই নিজের বিজয় ঘোষণা করেন। এখানেও ট্রাম্পের খামখেয়ালীপনা। যা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একেবারেই বেমানান। তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্র সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের সবক বিলি করে। ট্রাম্পের এমন আচরণে স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাস্ট্রের সুশিল সমাজ বিব্রত। খোদ রিপাবলিকানরাও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রচার শিবির থেকে একের পর এক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। যদিও এর স্বপক্ষে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ হাজির করা হচ্ছে না। এতে রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতারা অস্বস্তিতে আছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে এ ধরনের অভিযোগ মার্কিন গণতন্ত্রের অন্যতম একটি ভিতের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে। এতে দলের ক্ষতিও কম নয়। বিশেষত জর্জিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে হওয়া সিনেট নির্বাচনের ফলের ওপর সিনেটে রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে কিনা, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের নির্বাচনে অস্বচ্ছতা সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে অথবা জনগণের রায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে সিনেট রুলস চেয়ারম্যান রয় ব্লান্ট সিএনএনকে বলেন, ‘আমার মনে হয় এ সম্পর্কিত আলোচনার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের উচিত তাঁর আইনজীবীদের কাছে দেওয়া।’ নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী কমিটির এই চেয়ারম্যান বলেন, ‘তাদের যদি মামলা করার থাকে, তবে তাদের তা করার সুযোগ রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ার একটি সময়ও রয়েছে।’

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যা-ই করা হোক না কেন, এমন নির্বাচন বিশ্ববাসীকে একটিই বার্তা দেয়। তা হলো নির্বাচনে প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকতে হয়। আর সেজন্যই সর্বশেষ সুইংস্টেটগুলোতে পিছিয়ে থেকেও জো বাইডেন বার বার দাবি তুলতে থাকেন ‘এভরি ভোট শুড বি কাউন্টেড’। অর্থাৎ প্রতিটি ভোট গণনা করতে হবে। ৩রা নভেম্বর নির্বাচনের পর তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন নির্বাচনের ফল পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা, উদ্বেগ দেখা দেয় চারদিকে।

ফক্স নিউজের রিপোর্ট অনুযায়ী ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে জো বাইডেন ২৬৪ তে দাঁড়িয়ে। ট্রাম্প ২১৪। এখানে এসেই আকস্মিকভাবে থমকে দাঁড়ায় নির্বাচনের ফল। জো বাইডেনের প্রয়োজন আর মাত্র ৬টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। ট্রাম্পের প্রয়োজন ৫৬ ভোট। এমন অবস্থা চলে দীর্ঘ সময়। এ সময় মূল যুদ্ধ শুরু হয় সুইংস্টেট নেভাদা, পেনসিলভ্যানিয়া, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায়। নেভাদায় অল্প ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন বাইডেন। তবে সেখানে যে তিনি জিতবেন এমনটা নিশ্চিত ছিলনা। শুরু হয় বিশ্লেষণ। বলা হয়, এখানে তিনি জিতলেই পেয়ে যাবেন এ রাজ্যের মোট ৬টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। ফলে তিনি পৌঁছে যাবেন ম্যাজিক নাম্বার ২৭০-এ। অন্যদিকে সম্ভাবনা উঁকি দিতে থাকে জর্জিয়া থেকে। সেখানে পিছিয়ে থাকা বাইডেন ক্রমশ লিড নিতে থাকেন। শুক্রবার দুপুর নাগাদ তিনি ট্রাম্পের চেয়ে ৪৫০ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন এ রাজ্যে। কিন্তু দুপুর তিনটার দিকে ট্রাম্পকে টপকে যান বাইডেন। তিনি এক হাজারের মতো ভোটে এগিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব মিডিয়ার সংবাদ শিরোনাম পাল্টে যেতে থাকে। বাইডেনের গতিতে ‘মোমেন্টাম’ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। কোন কোন মাধ্যম লিখে ফেলে ‘জর্জিয়ায় অল্প ব্যবধানে এগিয়ে বাইডেন, পথ করে নিলেন হোয়াইট হাউসের’। সেই জর্জিয়াতেই তিনি বিজয়ের হাসি হাসবেন এমনটা যেন সময়ের ব্যাপার। এখানে আছে ১৬টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। ২৬৪ এর সঙ্গে তা যুক্ত হয়ে দাঁড়ায় ২৮০। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে একজন প্রার্থীর প্রয়োজন ২৭০টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দাবি করেন ডেমোক্রেটরা ভোটে কারচুপির চেষ্টা করছে। তার এ বক্তব্য তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। উপস্থাপক জানিয়ে দেন, ট্রাম্পের এ বক্তব্য সংশোধন করতে হবে। এ ছাড়া তিনি ভোটে কারচুপির মিথ্যা অভিযোগে মামলা করেন কয়েকটি রাজ্যে। তার মধ্যে জর্জিয়া ও মিশিগানে আইনি লড়াইয়ে তিনি হেরে যান। আদালত রায়ে বলে, ভোট কারচুপির কোনো প্রমাণ নেই। তাই ওই মামলা খারিজ করে দেয় আদালত। তবে ট্রাম্প টিম নেভাদায় অনিয়মের অভিযোগে মামলা করে। বৃহস্পতিবার ফিলাডেলফিয়াতে ভোট গণনা বন্ধের জন্য জরুরি আবেদন করে ট্রাম্প টিম। কিন্তু তাদের সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করেন একজন ফেডারেল জজ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানামুখি বাগাড়ম্বর অপরদিকে বাস্তবতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল রিপাবলিকান শীর্ষ নেতৃবৃন্দের অবস্থান যুুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। সেখানে ক্ষমতার শীর্ষ নেতৃত্বকে দিকনির্দশনা দেবার অনেকেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমনই। গণতান্ত্রিক দাবি করা অনেক দেশেরই তা ফলো করা উচিত। ট্রাম্পের এসব বাগাড়াম্বরের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি ফোর্স সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বিশ্বের অনেক দেশে এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দীকে হয় নজরবন্দি বা কারাবন্দি করার নজির আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন প্রতিদ্ধন্দীতাপূর্ণ নির্বাচন নিকট অতিতে আর দেখা যায়নি। এমন উত্তেজনাও ছিলো না। প্রতিদ্বন্দীতা ও উত্তেজনা ছাপিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষের দৃঢ়চেতা দায়িত্ববোধ নিঃসন্দেহে বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

অপরদিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও জো বাইডেন অতি উচ্ছোসিত নন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বার বার দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলছেন। এখনো নিশ্চিতভাবে কারো বিজয় ঘোষিত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক