মোহাম্মদ আলম :
কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে লকডাউন রয়েছে। সে কারণে তৈরি পোশাকের চলমান ক্রয়াদেশের ওপর স্থগিতাদেশও আসতে শুরু করেছে। নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রথম ধাপে সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজের কারনে পোশাক শিল্প ঘুড়ে দাড়িয়েছে। টিকে থাকলে ঘুড়ে দাড়াতে সময় লাগবে না বলে পোশাক মালিক ও কর্মকর্তাদের অভিমত।
গাজীপুরের কয়েকটি কারখানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হবার পর বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম তাদের বেশ কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে ক্রয়াদেশ স্থগিত করে ই-মেইল দিয়েছে। একইভাবে সিঅ্যান্ডএ, আলদি, ইন্ডিটেক্স চলমান ক্রয়াদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
৪০ বছর পোশাক শিল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা নর্দাণ কর্পোরেশনের নির্বাহী পরিচালক হাসিব উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের শক্ত ভিত রয়েছে। বায়ার চাইলেও রাতারাতি অন্য দেশে কাজ করতে পারবে না। এই করোনাকালে শুধুমাত্র টিকে থাকতে পারলেই ভবিষ্যতে দ্রুতই ঘুড়ে দাড়াবে পোশাক শিল্প। তিনি বলেন, তাদের জাপানি বায়ার পাকিস্তানে অর্ডার করে পোশাকের মান ঠিক রাখতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার তাদের কাছে ফিরেছে।
গাজীপুরে তৈরি পোশাক কারখানার একাধিক ইউনিট রয়েছে এমন কারখানা মালিক কয়েকজনের সাথে কথা হয়েছে। আজিজ চৌধুরী ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএ’র সদস্য মোঃ সালাউদ্দিন চৌধুরী। তিনি তরুণ উদ্যোক্তা এবং ডিবিসি টেলিভিশনের পরিচালক। নিয়মিত পোশাক শিল্পের সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন। তিনি জানান, ইউরোপে আবারও লম্বা সময়ের জন্য লকডাউন আরোপ করা হলে মৌসুমের বড় বিক্রি হারাবে ক্রেতারা। এতে অবশ্যই নতুন ক্রয়াদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেটি হলে অনেক কারখানাতেই প্রয়োজনীয় ক্রয়াদেশ থাকবে না। করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময়কালে ৩১৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ প্রাথমিকভাবে বাতিল ও স্থগিত হয়েছিল। পোশাক কারখানাগুলোর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার বিশেষ প্রনোদনা প্যাকেজ সহযোগীতা দেয়। সরকার রপ্তানিমুখী শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। পরে তহবিলের আকার বাড়ানো হয়।
তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে কত কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে তা সুনির্দ্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তার প্রতিষ্ঠান স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেড কারখানায় নিয়মিত পোশকের ক্রয়াদেশ দেয় ইতালির বায়ার জুজুপা। করোনার ২য় ঢেউ ইতালিতেও আছে। তারা প্রায় ৫ কোটি টাকার রেডি গার্মেন্টস শিপমেন্টস নিচ্ছে না। অর্ডার কেনসিলও করেনি। তবে ইতমধ্যেই তিনি কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখন। কারন ব্যাংকে গ্যারান্টি দিয়ে সুই সুতা আনা হয়েছে। ব্যাংক ফোর্স লোন করেছে। এখন ইনটারেষ্ট কাউন্ট হচ্ছে। একইসাথে কারখানার শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। অপরদিকে নতুন অর্ডারও আসছে না। কারখানার মালিক হিসেবে সবদিক থেকেই তিনি ক্ষতির সম্মুখিন।
দেশের অন্যতম বৃহত এবং স্বনামধন্য পোশাক কারখানা তুসোকা গ্রুপ। গাজীপুরে তুষোকার ৫টি ইউনিট রয়েছে। একজন পরিচালক জানান, তাদের কারখানায় বিশ^ খ্যাত ব্র্যান্ড এইচএন্ডএম এর নিয়মিত ক্রয়াদেশ থাকে। সুইডেনভিত্তিক এই ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের পোশাক কিনে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায় প্রস্তুত হওয়া এইচঅ্যান্ডএমের পোশাক বিশ্বের ৭২-৭৩ দেশে যায়। করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়েছে এইচঅ্যান্ডএম। কারণ, তুরস্ক ও চীনের চেয়ে বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদনের খরচ তুলনামূলক কম। তবে করোনা দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হবার পর তৈরী পোশাকের শিপমেন্ট কমেছে। সপ্তাহে যেখানে ২০ হাজার পিস শিপমেন্ট হয়েছে এখন সেখানে ৫ হাজার পিস শিপমেন্ট হয়। কখনো কখনো ডিলে শিপমেন্ট হচ্ছে।
তুসোকা গ্রুপ তাদের কারখানায় এইচএন্ডএম ছাড়াও জারা, এমএনএস, ইসিআই, নিউইয়র্কার, জিএমএস, গ্রুপ ডায়নামাইটসহ বিশে^র নামিদামি ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরী করে। ফ্রান্স, জাপান, স্পেন, যুক্তরাজ্য, পোলান্ড, সুইডেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বিশে^র সব মহাদেশেই এসব তৈরী পোশাক রপ্তানী করা হয়। তুসোকা গ্রুপ তাদের ৫ টি ইউনিটে প্রতি মাসে ২০ লাখ পিস পোশাক তৈরী করে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হবার পর তা কমে ১০-১২ লাখ হচ্ছে।
সালাউদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, করোনার প্রথম ঢেউ শুরুতে পোশাক কারখানা হিমশিম খাইতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী প্রণোদনা প্যাকেজের কল্যাণে পোশাক শিল্প অনেকটাই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ঘুরে দাড়িয়েছে। নতুন অর্ডারও আসতে শুরু করেছে। এর মাঝেই ইউরোপে আবার লকডাউন। শিপমেন্ট কম নিচ্ছে বা কোন কোন ক্ষেত্রে বন্ধ। পাশাপাশ নতুন অর্ডার আসছে না। বায়ারের কোন দোষ দেয়া যাচ্ছে না।
তারপরও পোশাক শিল্প ঘুরে দাড়াবে বলে বিশ^াস করেন এই তরুণ উদ্যোক্তা ও জনাব চৌধুরী। করোনা তাদের কিছু শিখিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। করোনা ধাক্কায়ও ভাল ও প্রকৃত বায়ার টিকে আছে। তারা ঘুরে দাড়িয়েছে। অতিতে না বুঝে শুনে অনেক ভুয়া বায়ারের সাথে কাজ করে কারখানা মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনাকালে সেই ধরনের বায়ার চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলদেশে পোশাক শিল্পের জন্য এটা অনেক ভাল হবে। পোশাক কারখানা মালিকদের উচিত হবে যেসব বায়ার এলসি বেইজ অর্ডার করে তাদের সাথে কাজ করা। কন্ট্রাক হিসেবে না। কারন ব্যাংক টু ব্যাংক এলসিতে অর্ডার করলে বায়ার সমস্যা করলেও ব্যাংক টাকা দিতে বাধ্য।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে সরকারিভাবে কিছু পদক্ষেপ দাবি করেন বিজিএমইএ’র সম্মিলিত পরিষদের এই ব্যবসায়ী নেতা। সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ঋণের কিস্তি স্থগিত রয়েছে। স্থগিতের মেয়াদ আরো বাড়ানো হোক। একইসাথে ব্যাংকে তাদের যে ঋণ তা পরিষোধের ক্ষেত্রে কিস্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে। আল্লাহর রহমতে প্রধানমন্ত্রীর উছিলায় পোশাক শিল্প বেঁচে গেছে। সরকারিভাবে আরো একবার প্রণোদনা দেয়া হোক। তাহলে গাজীপুরের ৮ শতাধিক কারখানাসহ সারা দেশের পোশাক কারখানাই রক্ষা পাবে।
