আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : “ইউক্রেন প্রকৃতপক্ষে কোন রাষ্ট্র নয়” রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের এই কথা থেকে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহ জাগে প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস কি বলে ? তিনি বলেছেন – ইউক্রেন কোন দিনই প্রকৃত অর্থে একটা রাষ্ট্র ছিল না। এখন যা ইউক্রেন তা আসলে ‘প্রাচীন রুশ ভূখণ্ড।’
প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ইতিহাস বহু শতাব্দী ধরেই এক সাথে জড়িয়ে আছে এবং অত্যন্ত জটিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন – উভয়েরই প্রধান ধর্ম অর্থোডক্স খ্রিস্টান। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং খাদ্য – এগুলো একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ অতি প্রাচীন শহর, এবং রুস জনগোষ্ঠীর একসময়ের রাজধানী। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাশিয়ার বর্তমান রাজধানী মস্কোর চেয়েও কয়েক শতাব্দী আগে । যে কারনে রুশ এবং ইউক্রেনীয় উভয় জনগোষ্ঠীই দাবি করে থাকে কিয়েভই হচ্ছে তাদের আধুনিক সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার মূল কেন্দ্র।
ইউক্রেন আর রাশিয়ার অভিন্ন উৎসের সবচেয়ে পুরোনো খোঁজ পাওয়া যায় ইউরোপের ওই অঞ্চলে স্লাভ জনগোষ্ঠীর প্রথম রাষ্ট্রের ইতিহাসে। সেটা ছিল মধ্যযুগের নবম শতাব্দীতে ‘কিয়েভান রুস’ সাম্রাজ্য। বর্তমান ইউক্রেন, বেলারুস এবং রাশিয়ার অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই কিয়েভান রুস। অদ্যাবধি যে কারনে এই তিন দেশই দাবি করে যে কিয়েভান রুসই হচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক পূর্বপুরুষ।
“কিয়েভান রুস” কথাটির সরল অর্থ হলো “কিয়েভের রুসদের আবাসভূমি।” তাদের রাজধানী ছিল কিয়েভ, আর এই রাজ্যের অধিবাসীদের বলা হতো রুস।
এই কিয়েভান রুসের প্রতিষ্ঠাতা ছিল ভাইকিংরা – যারা এ যুগের উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা সুইডেন-নরওয়ে-ডেনমার্ক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর লোক। রুশ জাতির আদি উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, কেউ বলেন – রুশদের আদি পূর্বপুরুষরা ছিল সুইডেনের, আবার আরেক দল ইতিহাসবিদ মনে করেন এটা ঠিক নয়, রুশরা হচ্ছে স্লাভ জনগোষ্ঠীর বংশধর।
কিয়েভ শহরটির অবস্থান এমন এক জায়গায় -যেখান দিয়ে নবম-দশম শতাব্দীতে অনেকগুলো প্রাচীন বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের পথ গড়ে উঠেছিল। ইউক্রেনের ভূ-প্রকৃতিরও আছে অনেক বৈচিত্র্য। এখানে আছে কৃষিজমি, বনভূমি আর কৃষ্ণসাগর হয়ে নৌচলাচলের পথ। তাই বিভিন্ন সময় বহু যোদ্ধা জনগোষ্ঠীর দখলে ছিল এই এলাকাটি।
এটাও ঠিক যে আধুনিক ইউক্রেনের কিছু অংশ বহু শতাব্দী ধরে রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কিন্তু ইউক্রেনের অন্য কিছু অঞ্চল আবার বিভিন্ন সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য, পোল্যান্ড বা লিথুয়ানিয়ারও অংশ ছিল। ইউক্রেনের ভূখণ্ড অটোমান তুর্কদেরও দখলে ছিল কিছু সময়ের জন্য।
পূর্ব ইউক্রেনে বহু রুশভাষী এবং মস্কোর প্রতি অনুগত লোক বাস করেন, সেখানে রাশিয়ার প্রভাবও গভীর – কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন ও রাশিয়ার যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের চিত্র আঁকতে চান।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালে কিয়েভে এক গণবিক্ষোভের পর ক্রেমলিন-সমর্থক সরকার উৎখাত হলে পূর্ব ইউক্রেনে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ শুরু হয় এবং দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক – এ দুটি ভূখণ্ড কার্যত ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন সোমবার রাতের ভাষণে এই দুটি অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, এবং সেখানে শান্তি রক্ষার কারণ দেখিয়ে রুশ সৈন্য পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে মস্কো বলতে পারবে যে তারা সেখানে সেনা পাঠানোর “আইনী বৈধতা পেয়েছে।
দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক – এ দুটিই পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে। ২০১৪ সালের আগে এই এলাকাটি ছিল খনিজ সম্পদ এবং ইস্পাত উৎপাদননের ভারী শিল্পের কেন্দ্র । এখানে কয়লারও বড় মজুত আছে।
দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক – দুটিরই কিছু অংশ কিয়েভের সরকারের নিয়ন্ত্রণে, আর বাকি অংশ রুশ-সমর্থক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে – যারা এ দুটিকে দুটি আলাদা ‘পিপলস রিপাবলিক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ।
দুটি অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ৩৮ লাখের মত এবং এদের একটি বড় অংশই রুশ অথবা রুশ-ভাষী। ২০১৪ সাল থেকে এখানে যুদ্ধে প্রায় ১৪ হাজার লোক নিহত হয়েছে।
ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যস্থতায় ২০১৫ সালে যে ‘মিনস্ক চুক্তি’ হয়েছিল – তাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন একমত হয় যে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলদুটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হবে – আর এর বিনিময়ে ইউক্রেন তার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। কিন্তু এ চুক্তির বাস্তবায়ন বার বার ঠেকে গেছে।
ইউক্রেনের “অসহিষ্ণু” আচরণের হাত থেকে ডনবাস এলাকার রুশ-ভাষী মানুষদের রক্ষার কথা বলে মস্কো সেখানকার বিদ্রোহীদের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলে ইউক্রেন এবং পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে – কিন্তু রাশিয়া তা অস্বীকার করে।
গত সপ্তাহে রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমা ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানিয়ে এক প্রস্তাব পাস করে। এর পর সোমবার এ দুই অঞ্চলের নেতারা ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তাদের স্বীকৃতি এবং সামরিক সমর্থন দেবার আহ্বান জানান।
