×

পদ্মার রাজশাহী অংশের পানি কঠিন ও তরল দুই ধরনের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে

ওবায়দুল ইসলাম রবি, রাজশাহী : রাজশাহী শহর ও চার উপজেলা থেকে কঠিন ও তরল দুই ধরনে বর্জ্য মিশে প্রতিনিয়ত পদ্মা নদীর পানিতে দূষণ বাড়ছে। নদী গবেষকদের তথ্য মতে নদী দূষণ বৃদ্ধি হতে থাকলে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের জীবনধারনে বিপর্যয় এবং পদ্মা নদীর জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হবে।

পদ্মা নদী সংলগ্ন বড়কুঠি, পাঠানপাড়া, দরগাড়া, শ্রীরামপুর, তালাইমারী এলাকায় রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠায় দেখা গেছে সেখানকার সব বর্জ্যই পদ্মা নদীতে ফেলা হয়। ভারতের গঙ্গা নদীই বাংলাদেশে পদ্মা নদী নামে পরিচিত হলেও বাংলাদেশের গোয়ালন্দ পর্যন্ত গঙ্গার অন্তর্ভুক্ত।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার পদ্মা নদী সংলগ্ন বুলনপুর, কেশবপুর, শ্রীরামপুর, কুমারপাড়া, সেখের চক, পঞ্চবটি, তালাইমারী ও শ্যামপুর এলাকা শহর রক্ষা বাঁধের পাশে নদীসংলগ্ন হওয়ায় বসত বাড়ির গৃহস্থালি সব ময়লা-আর্বজনাই পদ্মা নদীতে ফেলা হয়। শহর রক্ষা বাঁধের পাঠানপাড়া, দরগাপাড়া, বড়কুঠি ও শ্রীরামপুরসহ রক্ষা বাঁধের পাশের্^ গড়ে উঠেছে রেঁস্তোরা। ওই সকল রেস্তোঁরার বিভিন্ন ধরনের ময়লা প্লাস্টিক, পলিথিন ও তরল বর্জ্য সরাসরি পদ্মা নদীতে ফেলছে। এছাড়া শহরের পাঁচটি স্লুইচ গেটের মাধ্যমে শহরের তরল বর্জ্যসহ নানা ময়লা পদ্মা নদীতে আসছে।

এবিষয়ে নদী সংলগ্ন কুমারপাড়া স্থানীয়রা এই প্রতিবেদক বলেন, তারা মহল্লার ময়লা নদীতে ফেলেন। তবে সড়কের ময়লা সিটি করপোরেশনের ভ্যান নিয়ে যায়।

কুমারপাড়ার সুবাসী দাশ বলেন, সিটি করপোরেশনের ভ্যান অনিয়মিত থাকার কারনে তারা ময়লা নদীতে ফেলেন।

গোলাম রসুল নামে এক দোকানদার বলেন, কেশবপুর পুলিশ লাইনের সামনের টি-বাঁধের ধারে গত ১০ বছর ধরে বাঁধের ওপর পান বিড়ির দোকানের প্লাস্টিকের কাপ, বোতল ও পলিথিনসহ নানা বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। ইতোপূর্বে সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা পতিত ময়লা গুলো পরিস্কার করতো তবে গত ৫-৬ মাস ধরে সিটি করপোরেশনের লোকজন আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছে না। যার কারনে প্লাস্টিকের কাপ, বোতল ও পলিথিন ও কাগজের ঠোঙ্গা সব পদ্মা নদীতেই ফেলা হচ্ছে। একইভাবে গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট এবং বাঘা উপজেলার বাস্তব চিত্রে পদ্মা নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে নানা ধরনের ময়লা ও বর্জ্য। এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পৌর মেয়রদের নেই কোন পদক্ষেপ।

ভারতের উত্তরপ্রদেশ পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (ইউপিপিসিবি) গবেষণায় বলছে, ভারতের মধ্যে গঙ্গা নদী দূষণের মধ্যে দ্বিতীয় এবং যমুনা নদী রয়েছে ৫ম স্থানে। গঙ্গা নদীর ধারে সহস্রাধিক শহর, শিল্প কারখানা, দর্শনার্থী ও তীর্থ স্থান অবস্থিত। তাদেও ব্যবহারিত বর্জ্য প্রতিনিয়ত পদ্মা নদীকে দূষণ করছে।

ভারতের হিন্দু বেনারস ইউনিভার্সিটির মহামানা মালিভিয়া রিসার্চ সেন্টার ফর গঙ্গার চেয়ারপার্সন প্রফেসর ত্রিপাঠী বলেছেন, এই কোভিডের কারণে গঙ্গা দূষণ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে ৮.৩ থেকে ১০ শতাংশ, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড হ্রাস পেয়েছে ৩.৮ থেকে ২.৮ শতাংশ, ব্যাক্টোরিয়াল অণুজীবের পরিমাণ প্রতি ১০০ মিলিমিটারে কমেছে ২২০০ থেকে ১৪০০ মিলিমিটার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, শহরের স্লুইচ গেটের মাধ্যমে যে সকল তরল বর্জ্য পদ্মা নদীতে পড়ছে। শহরের দরগাপাড়া এলাকায় তরল বর্জ্যে ক্ষতিকর উপাদান বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এসকল বর্জ্যে ফলে পদ্মা নদীর পানি প্রতিনিয়িত দূষিত হচ্ছে। পদ্মার জলজ জীবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। ইতিমধ্যে দেখা গেছে শহরের বেশির ভাগ তরল বর্জ্য নদীতে পড়ে জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে গেছে। মাছসহ জলজ প্রাণীর পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

তাঁর মতে, পদ্মা নদীর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে প্লাস্টিকের পন্য। এসব নদীর পানির দূষণ বাড়াচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহার কমানোর আন্দোলন করেও কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান, সেভ দ্য ন্যাচার অ্যান্ড লাইফের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, গত কয়েকবছর পূর্বে পদ্মা নদীতে স্লুইচ গেটের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নদী পড়ছে। ওই সকল এলাকায় গবেষণা করে দূষণের মাত্রা ব্যাপক পাওয়া যায় এবং তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিক, পলিথিনের বর্জ্য নদীর পানি ব্যাপক মাত্রায় দূষণ করছে এবং জীববৈচিত্র্য সংখ্য কমছে। বর্তমান পদ্মা নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। গবেষণায় পদ্মা নদীর পানি কৃষি কাজে ব্যবহারের ফলে কৃষি জমিতে ধাতব পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে।

এইজন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার দূষক পরিশোধনকারী প্ল্যান্ট রাজশাহীতে নেই। রাজশাহীতেই পদ্মা নদীর পানি দূষণ হচ্ছে না, পদ্মা নদীর উৎপত্তিস্থল হিমালয় থেকে শুরু করে পদ্মা নদীর দুই ধারে অসংখ্য শহর রয়েছে তারাও পদ্মা নদীকে ব্যাপক মাত্রায় দূষণ করছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ জানান, পাঁচটি স্লুইচ গেটের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের তরল বর্জ্য পদ্মা নদীতে পড়ছে। তাছাড়া ময়লা গুলো অপসারণ করার কোন বিকল্প ব্যবস্থাও নেই।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, সিটি করপোরেশনের তীর সংলগ্ন এলাকায় ময়লা নিয়ে আসার জন্য ভ্যান দেয়া আছে। এবিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলদের সাথে কথা বলে সঠিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।