মোহাম্মদ আলম : ৪৮ বছর কেটে গেলো। খবরের কাগজ বিলি করাই তার পেশা। যিনি অল্পতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন তার চেয়ে সুখি কেহ নাই। ৬৮ বছরের আবুল কাশেম তেমনই একজন সুখি মানুষ। প্রতিদিন শ’দেড়েক খবরের কাগজ আর গোটা কয়েক ম্যাগাজিন বিক্রিতেই তার সংসার ৬৭ বছর বেশ চলেছে। বাঁধ সেধেছে এই করোনা মহামারি। তার সুখের ঘরে কষ্টের হাতছানি।
‘এইটার প্রতি আমার একটা মমতা আছে। এখন আর চলতাছে না। কষ্ট হয় চলতে। দৈনিক পত্রিকা বিক্রি ২৫ পার্সেন্টে আইসা পরছে।’ জয়দেবপুর পৌর মার্কেটে সামনে খবরের কাগজের হকার আবুল কাশেম সকলের চেনা মুখ। একটি লোহার র্যাকে থরে থরে পেপার ও টেবিলে কিছু ম্যাগাজিন সাজিয়ে এই করোনাকালেও প্রতিদিন বসেন। অশ্রুসজল নয়নে এভাবেই করোনাকালে নিজের কষ্টের কথা ব্যক্ত করছিলেন আবুল কাশেম।
করোনায় প্রান্তিক মানুষের ক্ষতিটাই বেশী। এইসব মানুষ ফজরের পর জীবিকার উদ্দেশ্যে বের হন। সারাদিন খেটে কিছু রোজগার হলে সন্ধায় পরিবারের কাছে ফেরেন। এটাই তাদের জীবন। কিন্তু করোনা মহামারি এইসব মানুষদের বেঁচে থাকার অবলম্বনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এইসব অল্পতে সুখি মানুষদের একটা বৈশিষ্ট হচ্ছে মজুর তার মজুরের কাজ নিয়েই থাকে, রিক্সা চালক কেবলই প্যাডেল ঘুড়ায় অথবা কৃষক তার মাঠে কাজ করাকেই উত্তম মনে করে। দিন শেষে তিন বেলা খাবার জুটলেই তারা খুশি। কিনতু করোনা মহামারিতে তাদের সুখের ঘরে আগুন লেগেছে। না পরছে অন্য কিছু করতে। আর হাত পাতার অভ্যাস তাদের একদমই নেই। করোনাকালে এইসব মানুষদের অনেক কষ্ট যাচ্ছে। জয়দেবপুরের সব থেকে জৈষ্ঠ্য খবরের কাগজের হকার মোঃ আবুল কাশেম তাদেরই একজন।
একজন মানুষ সৎভাবে জীবন যাপন করলে তার সমাজ জীবনে কত সাফল্য ধরা দিতে পারে আবুল কাশেম তার জ¦জল্যমান দৃষ্টান্ত। নিজের অক্ষরজ্ঞান নাই। তবে তিন ছেলেকেই উচ্চ শিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলে মাষ্টার্স শেষ করে নিজেই ফটো কম্পোজের দোকান চালায়। মেঝ ছেলে অনার্স পাশ। ছোটটা অনার্স পরে। পরের দুই জনই পোশাক কারখানায় চাকুরী করে। ছেলেরা তাকে বরাবরই কাগজ বিক্রি করতে নিষেধ করে। কিন্তু তিনি কারো কথা শুনেন না। খবর বিলি কেবলই তার রোজগারের নেশা না, এটার সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক। আবেগে ধরে আসা কন্ঠ সে কথাই জানান দেয়।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম আবুল কাশেমের আদি নিবাস। যুদ্ধের পরের বছরই রাজধানীর শাহাজাহান পুর এলাকায় খবরের কাগজ বিক্রি শুরু করেন। কয়েক বছর ট্রেনে খবরের কাগজ বিলি করতে করতে শ্রীপুর কাপাসিয়া পর্যন্ত যেতেন। ১৯৮৭ সালে গাজীপুরে চলে আসেন। ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি পৌছে দিতেন খবরের কাগজ। ৭/৮ বছর হলো পৌর মার্কেটের সামনে থিতু হয়েছেন। মাঝে কত কিছু ঘটে গেলো। কত পরিবর্তন। সুখি আবুল কাশেম আনন্দের সাথে সব ভালমন্দ খবর বিলি করেই গেছেন। তার মাঝে কোন পরিবর্তন নেই। পরিবর্তন নিজের ঘরেও হয়েছে। উচ্চ শিক্ষিত ছেলেরা হকার পিতার কাজে একটু লজ্জা বোধ করে। কিন্তু আবুল কাশেম একই রকম। অর্থের লোভ, উচ্চাকাঙ্খা, ভোগ বিলাশ বা হিংসা কোন কিছুই তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। তিনি খবর বিলির মায়ায় জীবন কাটিয়ে দিলেন।
সরকার অথবা আমাদের মত পেশাজীবিদের অনেক সমস্যার মাঝে একটি হচ্ছে নীচের দিকে না তাকানো। আমরা(আমিও) ভোর হলে খবরের পেছনে ছুটি। আমাদের পিএম বিট, সচিবালয় বিট, স্বাস্থ্য বিট বা এমন অনেক বিট আছে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বিট নেই। অথবা কৃষক বিট নেই। আমরা কিন্তু প্রতিদিন মেয়র, মন্ত্রী, ডিসি, কমিশনারদের খবর খুঁজি। আবুল কাশেমদের খবর খুঁজি না। অথচ দেখুন দেশের এইসব প্রান্তিক মানুষদের সংখ্যাটাই বেশী।
যদি সুখি জীবনের কাহিনি খুঁজেন তবে এইসব মানুষদের মাঝেই সুখের ঝলক পাবেন। সেই ছাত্র জীবনেই পড়েছি, ‘সুখি মানুষের জামা থাকে না’। আবুল কাশেমের মাথা গোজার ঠাই নাই। ভাড়া থাকেন। আবুল কাশেম ৪৮ বছর রোজগারে এক টুকরো মাথা গোঁজার ঠাই বানাতে পারেন নি। কিন্তু বেশ জোড় দিয়েই বললেন, ‘বাবা আল্লায় সুখেই রাখছে’। এটাই তার মনের কথা। সুঠাম দেহ আর শশ্রুমন্ডিত হাসি মাখা মুখ সে কথাই জানান দেয়।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কোন পরিসংখ্যান নেই। সম্প্রতি গাজীপুরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাদের কাছে তাতি বা কামারের পরিসংখ্যান নেই। হয়ত হকারেরও নেই। এটা থাকা উচিত। দেশ উন্নত হচ্ছে। উন্নয়নের পথে শুধুমাত্রই কি বড় বড় দালান কোঠা আর পিচ ঢালা পথের অবদান। এইসব প্রান্তিক মানুষের কি কোন অবদান নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আচরনে তেমনই মনে হলো। তাদের কাছে কারখানার হিসাব আছে। বড় বড় অট্রালিকার হিসাব আছে। বিপনি বিতানের হিসাব আছে। কিনতু এইসব অট্রালিকা শ্রমিক, কারখানা শ্রমিক আর হকারের হিসাব নেই। আমাদের এই উন্নয়ন টেকসই হবে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য সব শ্রেনী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।
আবুল কাশেম অথবা মনিন্দ্র কর্মকার হচ্ছেন সুখি জীবনের পাঠ। জীবনে সুখি হতে হলে নিজের কাজকে ভালবাসতে হবে। তারা যেমনটি করেছেন। আবুল কাশেমদের মত নিজ নিজ কাজ সততার সাথে সঠিক ভাবে সম্পন্ন করলে সমাজে কোন সমস্যাই থাকতো না। করোনা মহামারিতেও কোন সমস্যা হতো না। আবুল কাশেমের পথই দেশ ও দশের মঙ্গল পথ।
