মোহাম্মদ আলম : দেশে লকডাউন চলছে। অর্থনীতি সচল রাখতে রপ্তানীমুখি শিল্প কারখানা মালিকদের দাবির মুখে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ কথা অনস্বীকার্য সবার আগে জীবন। তাই কারখানা মালিক-শ্রমিক বা কর্মচারী-কর্মকর্তা সবারই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অগ্রগণ্য। মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউনের মাঝেও কারখানা খোলা রাখার ব্যপারে বিজিএমইএ দশ দফা পরামর্শ দিয়েছে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে গাজীপুরের অধিকাংশ পোশাক কারখানা নিজেদের পরামর্শ বাস্তবে মেনে চলছে না। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মহানগরের টঙ্গীতে তুসোকা গ্রুপের তুসোকা স্টিচেস কারখানা। তুসোকা স্টিচেস কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের কাজ করানো অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। কারখানার ২১ সদস্যের করোনা টাস্কফোর্স দল কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ করে থাকে।
জানা গেছে, বিজিএমইএ’এর দশটি পরামর্শ হচ্ছে- পরিচালনার ধাপসমূহ, ঘনত্ব হ্রাস, প্রবেশ প্রটোকল, সামাজিক দূরত্ব, ছুটি নীতি, জীবানুমুক্তকরন চেম্বার, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার গাইডলাইন, প্রশিক্ষন, কর্মক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সন্দেহভাজন পাওয়া গেলে করনীয় বিষয়সমূহ এবং উত্তম চর্চা।
মহানগরের টঙ্গী সাতাইশ এলাকায় তুসোকা স্টিচ কারখানায় সরজমিনে দেখা গেছে, সকাল ৭ টার মধ্যে কারখানার সামনে শ্রমিকরা লাইন ধরে জীবাণুমুক্ত চেম্বারের ভিতর দিয়ে কারখানায় প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। এর পূর্বে কারখানার প্রধান ফটকের পাশে সারিবদ্ধ পানির টেপে সাবান দিয়ে হ্যান্ড ওয়াশ করা হয়। তাদের সবার মুখে কাপড়ের মাস্ক। কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে ২টি পুনঃ ব্যবহারযোগ্য কাপড়ের মাস্ক সরবরাহ করে। প্রধান ফটকেই শরীরের তাপমাত্রা মাপক গান দিয়ে প্রত্যেকের কপালে রশ্মি ফেলে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। প্রত্যেকের শরীরের তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৫ এর মধ্যে থাকলে তবেই সে শ্রমিক কাজে যোগদান করতে পারে। কারখানার ভিতরে নিজ নিজ বক্সে রাখতে প্রধান ফটক থেকেই জুতা খুলে একটি পলি ব্যাগে ভরে নেয়। একটি ট্রেতে স্যানিটাইজার ভিজানো চটে খালি পা ভিজিয়ে হাতে স্যানিটাইজার স্প্রে করে নিচ্ছে। পা’য়েও স্যানিটাইজার স্প্রে করা হয়। কারখানার প্রধান ফটক থেকে শ্রমিকের কাজে বসার স্থান প্রায় ৫০ গজ দূরত্ব। এই দূরত্বে যেতে ৩ ফুট ব্যবধান বজায় রেখে হেটে শ্রমিকরা নিজ নিজ আসনে বসেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, ৪ তলা ভবনের প্রতি ফ্লোরে ৬৫ হাজার বর্গফুট স্পেস রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এই স্পেসে ১২ লাইন মেশিন বসানো যাবে। তবে করোনায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৯ লাইন রাখা হয়েছে। এতে এক লাইন থেকে অপর লাইনের দূরত্ব ৩ ফুটের অধিক। অপরদিকে লাইনে ৭৫ এর স্থানে ৫৮ টি মেশিন বসানো। এতে করে এক মেশিন থেকে অপর মেশিনের দূরত্ব ৩ ফুটের বেশী।
এই পদ্ধতিতে খুব সহজেই শ্রমিকরা প্রবেশ প্রটোকল মেনে ঘনত্ব হৃাসের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে পারছেন।
কারখানায় দেখা গেছে, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা জীবনুনাশক মিশ্রিত পানির বালতি ও মপ হাতে সদা তৎপর। কোন শ্রমিক বা কর্মকর্তা কর্মচারী ফ্লোরে হেটে গেলে সাথে সাথে তারা সেখানে পরিস্কার করছেন। কাজ শেষে দরজার হাতল, সিড়ির রেলিং, বসার চেয়ার বা টুল, মেশিন প্রতিদিন জীবনানাশক দিয়ে পরিস্কার করা হয়। কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকদের ব্যবহৃত শৌচাগারের পরিবেশ অত্যন্ত স্বাস্থ্য সম্মত।
ছুটিনীতি পালনেও তুসোকা স্টিচেস শতভাগ বিধান মেনে চলে। কারখানার স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ শাহাজ উদ্দিন মাহমুদ জানান, কারখানায় সার্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, একজন নার্স ও ২ জন সহযোগী রয়েছে। কোন শ্রমিকের শরীরের তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৫ এর বেশী, খুশকি কাশ বা করোনার লক্ষণজনিত কিছু থাকলে তাকে প্রাথমিকভাবে ৭ দিনের স্ব-বেতন ছুটি দেয়া হয়। ছুটিতে থাকা অসুস্থ শ্রমিক তার লাইন চিফ এবং সুপারভাইজারের তত্বাবধানে হোম আইসোলেশনে থাকে। কারখানায় তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার পর বিনামূল্যে ঔষধ দেয়া হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে লাইন সুপারভাইজার নিয়মিত মুঠোফোনে শ্রমিকের শারীরিক খবর রাখেন। তারপরও প্রয়োজন হলে কারখানার নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে হাসাপাতালে নেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
তুসোকা স্টিচেস’এর পরিচালক মোঃ তারেক হাসান করোনাকালেও নিয়মিত এই কারখানায় অফিস করে আসছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সবার আগে। তাদের কোভিড টাস্কফোস কঠোরভাবে বিজিএমইএ’র পরামর্শ মোতাবেক সবকিছু বাস্তবায়ন করছে। কারখানার কমপ্লায়েন্স শাখা প্রতিদিন টাস্কফোর্সের কার্যক্রম তদারকি এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে থাকে।
ছবির -১ ক্যাপশন : গাজীপুরের টঙ্গীতে তুসোকা স্টিচেস কারখানার শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব ও প্রবেশ প্রটোকল মেনে কারখানায় প্রবেশ করছে।
ছবি-২ ক্যাপশন : গাজীপুরের টঙ্গীতে তুসোকা স্টিচেস কারখানার শ্রমিকরা প্রবেশের পূর্বে হ্যান্ড ওয়াশ করছে।
ছবি -৩ ক্যাপশন : গাজীপুরের টঙ্গীতে তুসোকা স্টিচেস কারখানার ফ্লোরে কম মেশিন বসিয়ে ও লাইন কমিয়ে ঘনত্ব হৃাস করা হয়েছে।
