অ আ আবীর আকাশ : আধুনিককালের যোগাযোগ বিপ্লব মূল্যায়নমূলক আলোচনার সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সংক্ষিপ্ত দু’কথা বলার জন্য আজকের এই আয়োজন। প্রশ্ন তুলতে পারি- ‘বর্তমান সময়ের যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিকাশে কোন মাধ্যম সবচেয়ে এগিয়ে ও সহজতরো?’
যোগাযোগ মাধ্যমের ক্রমবিবর্তনের ফলে আধুনিক সভ্যতা ও কম্পিউটার যুগের এ প্রযুক্তির সময়ে বিবর্তনশীল পরিপ্রেক্ষিত (Evolutionary perspective) ফেসবুক হয়ে উঠেছে শক্তিশালী মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে টুইটার, ইনস্টাগ্রাম। তৃতীয় স্থান ছেপে আছে লিংকডইন।
ফেসবুক মানুষের এতো কাছে এসে পৌঁছেছে যে, প্রতিটি স্মার্টফোনে এই অ্যাপসটি মোবাইল কোম্পানি থেকেই ইন্সটল করা থাকে। যা বিশ্বের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার শক্তিমান মাধ্যম। সমাজের কিছু সচেতন নাগরিক টুইটার ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছেন। শিক্ষিত বিদগ্ধজনেরা লিংকডইন (lindkin) ব্যবহারে বাংলা ইংরেজি দুই মাধ্যমেই মত প্রকাশ করছেন। যা এখনো জনসাধারণের কাছে এসে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। ঢালাওভাবে এই ফেসবুক ছাড়া অন্যন্যা অ্যাপস ব্যবহারে সিদ্ধ হতে পারেনি জনগণ।
প্রথম আলো পত্রিকায় আজকে কোন নিউজগুলো প্রাধান্য পেয়েছে বা শিরোনাম হয়ে এসেছে তা যেমন যুগান্তর পত্রিকা পাঠকের জানার সুযোগ নেই তেমনি চ্যানেল আই (channel-i) দেখা দর্শক জানতে পারেনা বাংলাভিশন টিভিতে (bangla vision) কি প্রচার হচ্ছে! কিন্তু ফেসবুক এমন একটি সফটওয়্যার বা মাধ্যম যেখানে সকল টিভি চ্যানেল পত্রিকা থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলোকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পাঠক বা দর্শকের সামনে হাজির করছে। ফেসবুকের সাধারণ পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার (5000) ফ্রেন্ড (friend) সংযুক্ত থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে লাখ লাখ ফ্রেন্ড (friend) সংযুক্ত হওয়ার পদ্ধতি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে রয়েছে।
একটা পত্রিকার সার্কুলেশন সংখ্যা যদি ৫ লাখ হয় তাহলে পাঠক সংখ্যা দ্বীগুণ যোগ করলে ১০ লাখ ধরা যায়। টিভি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা ১০ লাখ ধরলে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপে ফ্রেন্ড সংযুক্তির সংখ্যা ২০ লাখ, ৩০ লাখ। এমনও ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে যেখানে ফ্রেন্ডের সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
পুঁজিবাদী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না বা কোনো সুযোগ নেই সেই অনুষঙ্গটিও কোনো সাধারন ফেসবুক ব্যবহারকারীর বদৌলতে খবরের মতো করে পাঠকের সামনে হাজির করে ফেসবুক। এর বাহিরেও যেকোনো খবর, টিকা, উক্তি, ছবি কিবা সাধারণ দৃশ্য, সিনারি, ভালোলাগা মুহূর্তেই দেশে-বিদেশে ভাইরাল হয়ে যায় এ ফেসবুকের কল্যানে। একজন সাধারন পাঠক তার মনের অভিব্যক্তি যেমন করে হাজার হাজার মানুষের সাথে শেয়ার করতে পারেন তেমনি অন্যদের মনের বাসনাগুলো জানতে পারেন। মোটকথা সকল টিভি চ্যানেল, পত্রিকা বা দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ নানা সঙ্গতি-অসঙ্গতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, বিনোদন, ভালোলাগা-মন্দলাগা, সফলতা, উন্নয়ন, বিজ্ঞান,এমনকি বিজ্ঞাপনসহ আরো নানা ষঙ্গ-অনুষঙ্গগুলোকে একত্র করে পরপর পাঠকের সামনে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়ার নাম ফেসবুক। ফেসবুক প্লাটফর্মে যত সহজে সবকিছু জানা ও জানানো যায় এর চেয়ে সহজ মাধ্যম দ্বিতীয়টি নেই। এর কারণ হলো ফেসবুক প্রতিটি স্মার্টফোনে থাকার সুবাদে একজন নিরক্ষর মানুষও তা চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠেন।
পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল দেখার সময় ও সুযোগ দুটোই এখন সাধারণ জনগণের নেই। জনগণ দেশ বিদেশের খবরা-খবরের জন্য ফেসবুকের উপর নির্ভর করছেন। চলার পথে একটু সুযোগ পেলেই ফেসবুকে ঢুঁ মেরে নিজেকে আপডেট রাখতে চান খোদ গণমাধ্যমের মালিক নিজেই। অথচ!
কোনো ব্যক্তির মনগড়া প্রকাশিত উক্তি ফেসবুককে খাটো করে দেয়া না দেয়ার কোন কারণ নেই। সারা পৃথিবীর মানুষকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম আর কি হতে পারে? তবে এর অপব্যবহার ব্যক্তিকেই দায়ী করে, এর অন্যথা কিছু নয়।
পুঁজিবাদী গণমাধ্যমব্যবসায়ীদের ব্যবসায় বিরাট ধাক্কা এই ফেসবুক। যে বা যিনি একে গণমাধ্যম বলে ভাবতে পারেন না তিনি নিজেও কয়েক মিনিট পর পর ফেসবুকে উঁকি মারেন। যিনি এর স্বীকৃতি দিতে নারাজ তিনিও তাঁর চ্যানেল বা পত্রিকার খবর ফেসবুকে প্রকাশ করেন। দেশি-বিদেশি এমন কোনো গণমাধ্যম নেই যেটি ফেসবুকে আসে না। শুধুমাত্র পুঁজিবাদী হিসেব কষে গণমাধ্যম মালিকরা একে গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
প্রেস কাউন্সিলের সচিব শ্যামল এই লেখকের সাথে তারই অফিসে একান্ত আলাপচারিতায় বলেন-‘ফেসবুক হলো পৃথিবীর সেরা গণমাধ্যম। শুধুমাত্র একে পুঁজিবাদী গণমাধ্যম ব্যবসায়ীরা মানতে নারাজ। না হয় ফেসবুক চালানোর উপর প্রশিক্ষণ দিতে পারতাম। কারণ প্রতিটি স্মার্টফোনে ছবি এডিট, ভিডিও এডিট করা যায়। লেখাগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণতার ভেতরে লিখলে, ভাষা ও শব্দ গঠনে চতুর দৃষ্টি রাখলে, অন্ধকার ছবিগুলো ক্লিয়ার করে দিলে, কতো সুন্দর চমৎকার পঠন যোগ্য হয়ে উঠে লেখাটি। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তাহলে ফেসবুক যে কত শক্তিশালী তা বোঝার অবকাশ রইল না।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
