×

‘শেখ হাসিনা’ উদ্ধাস্তু থেকে মানবতার জননী

শতাব্দী আলম : ‘এদের (রোহিঙ্গা) দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমার ছোট বোনকে নিয়ে ছয় বছর উদ্ধাস্তু জীবন কাটিয়েছি।’ জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেছেন। শেখ হাসিনার পক্ষেই এমন অবলিলায় নিজের জীবনের দুঃসময়ের কথা বলা সম্ভব। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভ জন্মদিন। বিশ্ব যখন শরণার্থী সমস্যায় হাবুডাবু খাচ্ছে তখন একজন সরকার প্রধান হিসাবে নিজের উদ্ধাস্তু জীবনের কথা স্মরণ করে মানবিক মূল্যবোধকে সম্মাণিত করেছেন। উদ্ধাস্তু বা শরণার্থী মানে একজন মানুষের জীবনের সব শেষ নয়। উদ্ধাস্তু জীবন থেকে সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে আবার ঘুরে দাড়ানো সম্ভব। বিশ্বের সর্বোচ্চ ফোরামে দাড়িয়ে সে কথাই বিশ্ব বিবেককে স্মরণ করিয়ে দিলেন। বিশ্বের লাখ লাখ উদ্ধাস্তু শরণার্থী শিশুর মাঝেই লুকিয়ে আছে নতুন কোন শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিও ভারতে উদ্ধাস্তু বা শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় পেয়েছিল। রোহিঙ্গা উদ্ধাস্তুদের আশ্রয় দিয়ে বাঙালি তার জাতীয় মানবিক ঋণ লাঘব করেছে। বিশ্ব দরবারে একজন সত্যিকারের মানবতার জননী হিসাবে শেখ হাসিনার অবদান দিন দিন উজ্জল্য ছাড়াচ্ছে। শুভজন্মদিনে সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মন বাক্যে প্রার্থনা করছি তিনি যেন দ্রুত সুস্থতা লাভ করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার আমরা শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা সময়োপযোগী নেতৃত্বের প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করেছি। কোন দ্বিধাদ্বন্দে না ভোগেই শরণার্থীদেয় আশ্রয় ও সহযোগীতার হাত বাড়ানো এর সর্বশেষ উদাহরণ। প্রতিবেশী ভারত সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। যেমন গত ২১ সেপ্টেম্বর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বললেন, ‘রোহিঙ্গারা হচ্ছে অনুপ্রবেশকারী।’ অনুপ্রবেশকারী, উদ্ধাস্তু বা শরণার্থী যে নামেই ডাকা হোক না কেন! আশ্রয় পাওয়া ওইসব মানুষের অধিকার। ১৯৭১’এর বাঙালি উদ্ধাস্তু আর ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা উদ্ধাস্তুদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। বাঙালি পল্লিকবি জসিমউদ্দিনের ‘দগ্ধ গ্রাম’ কবিতার একটি পঙতিতে ১৯৭১ এর বাস্তব চিত্র যেমন জ্বজল্যমান রয়েছে তেমনি ২০১৭ সালের রাখাইন রাজ্যের নারকীয় ধ্বংশযজ্ঞের চিত্রও ফুটে উঠেছে। ‘‘কিসে কি হইল, পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি, সারা গাঁও ভরে আগুন জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি, মুহুর্তে সব শেষ হয়ে গেল ভষ্মাবশেষ গ্রাম, দাড়ায়ে রয়েছে দগ্ধ দুটি আধ পোড়া খাম।’’ পশ্চিম পাকিস্তানের দূর্বৃত্ত্ব শাসকের লালায়িত সেনাবাহিনীর হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট থেকে রক্ষা পেতে বাঙালি উদ্ধাস্ত হয়েছে। ঠিক একইভাবে মায়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট, ধর্ষণ চলছে। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে ভষ্মিভুত। বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ নচেৎ নৃশংস হত্যার শিকার। বাধ্য হয়েই হিন্দু- মুসলিম- খ্রীস্টান ওইসব রোহিঙ্গা মানুষ উদ্ধাস্তু হয়েছে। তাঁরা কোনভাবেই অনুপবেশকারী হতে পারে না। ভারত সরকার ১৯৭১ সালে বাঙালি উদ্ধাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছিল। সেজন্য বাঙালি হিসাবে আমরা অবশ্যই তাদের কাছে ঋণী এবং চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু সেখানে তাদের ঐতিহাসিক স্বার্থ জড়িত ছিল। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদেও ঘিওে বাংলাদেশের কোন স্বার্থ নেই। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেবলই মানবিক দায়বদ্ধতা। শেখ হাসিনা জাতিসংঘের অধিবেশনে দাড়িয়ে সে কথাই বলেছেন।
লেখার শিরোনাম ‘উদ্ধাস্তু থেকে মানবতার জননী’ শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবন এবং সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করে। শেখ হাসিনা কেবল তাঁর উদ্ধাস্তু জীবনের কথা বলেছেন। কিন্তু বাঙালি মাত্রই জানেন বঙ্গবন্ধু কণ্যার বাল্যকাল, কৈশর, যৌবন থেকে রাজনৈতিক জীবনও নানান চড়াই-উৎড়াই সংগ্রামের মাঝে যাচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অত্যন্ত সততা, দৃঢ়তা এবং সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাও তিনি দৃঢ়তা এবং সাফল্যের সাথে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। রোহিঙ্গারা যদি কোনদিন তাদের অধিকার ফিরে পায় সেজন্য শেখ হাসিনার অবদানই সব থেকে বেশী স্মরণ করা হবে। এই মানুষটি শিশু কিশোর বেলায় বিপ্লবী পিতার সংসর্গ আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পিতা বঙ্গবন্ধু জীবনের ১৮টি বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। মুক্তজীবনে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের অধিকারের প্রশ্নে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশী সময় পরিবারের সংস্পর্শে থাকার সুযোগ পাননি। তিনি যৌবনে পিতা মাতাসহ পরিবারের সব সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হতে দেখলেন। ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট হত্যা চেষ্টা ছিল ভয়াবহতম। এত কঠিন জীবন সংগ্রামের শিড়ি মাড়িয়ে টিকে থাকা এবং নিজ জাতির নেতা হওয়া মহান আল্লাহপাকে নেক রহমতেই সম্ভব। ২০০৭ সালে শেরেবাংলা নগরের সাব জেলে বসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ভুমিকা লিখতে গিয়ে ব্যক্তি শেখ হাসিনার আবেগের কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। ‘‘ছোট বোন শেখ রেহানাকে ডাকলাম। দুই বোন চোখের পানিতে ভাসলাম। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পিতার স্পর্শ অনুভব করলাম। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি; তারপরই এই প্রাপ্তি। মনে হল যেন পিতার আশীর্বাদের পরশ পাচ্ছি। আমার যে এখনও দেশের মানুষের জন্য- সেই মানুষ, যারা আমার পিতার ভাষায় ‘দুঃখী মানুষ’, – সেই দুঃখী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ বাকি, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ বাকি, সেই বার্তাই যেন আমাকে পৌছে দিচ্ছেন। যখন খাতাগুলোর পাতা উল্টাছিলাম আর হাতের লেখাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম আমার কেবলই মনে হচ্ছিল আব্বা আমাকে যেন বলছেন, ভয় নেই মা, আমি আছি, তুই এগিয়ে যা, সাহস রাখ। আমার মনে হচ্ছিল, আল্লাহর তরফ থেকে ঐশ্বরিক অভয় বাণী এসে পৌঁছাল আমার কাছে। এত দুঃখ-কষ্ট-বেদনার মাঝে যেন আলোর দিশা পেলাম।’’ আজকে যখন সদ্য প্রসূত রোহিঙ্গা শিশুর নাম রাখা হয় ‘শেখ হাসিনা’। তখন বলতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি সত্যিই শান্তির দূত যিনি পিতার আর্শীবাদে মানবিকতার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। একজন সত্যিকারের ‘মানবতার জননী’
সেপ্টেম্বর এলেই বিশ্বে ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কারন ৬ অক্টোবর শুক্রবার সকাল এগারটায় নরওয়ের নোবেল কমিটি সে বছরের শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে। আশান্ত পৃথিবীতে যে কোন শান্তি পুরস্কারেরই আবেদন অনেক বেশী। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই হচ্ছে শান্তিতে থাকা। সুখে থাকা। বিশ্বের এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনা অবদান রেখেছেন। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদি মাওবাদি নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে হাসিনা সরকার। মাওবাদিদের সাথে ভারতের বিজেপি সরকার আলোচনা শুরু করে। বর্তমানে মাওবাদিরা রাজনীতির মুলধারায় ফিরে আসছে। যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার সহায়ক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উপজাতি অধ্যুসিত পার্বত্য চট্রগ্রামে বিচ্ছিন্ন সংহিসতা লেগেই থাকত। শেখ হাসিনা সরকার ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদি গোষ্ঠিারা চিরতরে বিদায় হয়েছে। বিশ্বে জঙ্গি ও সন্ত্রসবাদী একটি প্রকট সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস বা আলকায়েদা, মায়ানমারের মগ-উগ্র রাখাইন বৌদ্ধ, ভারতের উগ্র হিন্দুত্যবাদী, ইসরাইলের ইহুদীবাদি গোষ্ঠি, ইউরোপ-আমেরিকায় সাদা-কালো মানুষের ভেদাভেদসহ কোথায় নেই সন্ত্রাসবাদ। বিগত বছর গুলোতে বাংলাদেশের ভূখন্ডেও এমন কয়েকটি সন্ত্রাসবাদের ঘটনা মাথা চাড়া দিয়েছে। সাম্প্রতিক অতিতে বাংলাভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির আর্বিভাব হয়েছে। সব জঙ্গি সংগঠন এবং জঙ্গি দলের সদস্যদের কঠোরভাবে দমন করতে সমর্থ হয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। গোয়েন্দা তৎপড়তার মাধ্যমে চিন্থিত করে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জঙ্গি আস্তানা। সবশেষে এসেছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। শেখ হাসিনা প্রথম দিন থেকেই রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় এবং নিজ দেশে পূর্ণবাসনের লক্ষ্যে আত্ম নিবেদিত হয়েছেন। নিজের উদ্ধাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে রোহিঙ্গাদের সহমর্মী-সহযাত্রী। জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলও ইউরোপে নিজ দেশে শরণার্থী আশ্রয় দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু প্রিয় পাঠক বাংলাদেশ এবং জার্মানির আর্থ সামাজিক অবস্থা এক নয়। সীমিত ভুখন্ড এবং দেশে খাদ্য সংকট থাকা সত্বেও বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীদের আশ্রয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। দল-মত নির্বিশেষ সর্বস্তরের মানুষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা করছে। ইতমধ্যেই জাতিসংঘের অধিবেশনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য সম্মানের এবং শেখ হাসিনার জন্য গর্বের। এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার যে কেহই পেতে পারে। তবে বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে নবজাতক ‘রোহিঙ্গা শেখ হাসিনা’ শান্তির প্রতীক হিসাবে বেঁচে থাকবে।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *