×

রাজশাহীতে কৃষিখাতে ক্ষতি পোষাতে এনজিওর দরজায় কৃষক

ওবায়দুল ইসলাম রবি, রাজশাহী : প্রধানমন্ত্রী ঘোষণায় কোভিড-১৯ এর প্রভাবে কৃষকদের প্রণোদনা ঋণ প্রকল্পে নানা জটিলতায় কেটেছে ২০২০। ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে রয়েছে বিভিন্ন জটিলতা। নানা শর্ত জুড়ে খামরিদের অনুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রণোদনা ঋণে নানা শর্ত জটিলতায় প্রণোদনার ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেক সিংহ ভাগ কৃষক ও খামারিরা। বিভিন্ন সূত্রমতে জানাযায়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দলিত নিতো কর্মিদের মদদে প্রকৃত কৃষক ও খামারির ঋণ থেকে বঞ্চিত হলেও বেনামী কৃষক ও খামারিরা হাতিয়ে নিয়েছে ঋণ। অধিক মাত্রায় সুদ দিয়ে জেলার বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা উত্তোলন করে জমি বিক্রয় করার উপক্রম হয়েছে কৃষকদের।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং রবি মৌসুমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় রাজশাহীতে সার ও বীজ সহায়তা তালিকায় ছিল ২৫ হাজার কৃষক। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় জেলায় রবি ২০২০-২১ মৌসুমে ২৫ হাজার জন কৃষকের জন্য ২ কোটি ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৯০০ টাকার সার ও বীজ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জেলার নয়টি উপজেলার অধিক ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে রবি মৌসুমে গম, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, মসুর, খেসারি, টমেটো ও মরিচ ফসলের জন্য বীজ ও সার সহায়তা ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৩০ টাকা আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলার পবা উপজেলায় ১ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে বীজের সহয়েতায় ১২ লাখ ২৯ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে, সারের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, অন্যান্য খাতে বরাদ্দ ৭১ হাজার টাকা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক উম্মে ছালমা (শস্য) জানান, গত বছর দফায় দফায় বন্যায় জেলার ৩৮ হাজার ৪৫০ জন কৃষক ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। যার মধ্যে ২৮ হাজার ৯০৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। যার আর্থিক ক্ষতি ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং রবি মৌসুমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় জেলায় ৯ উপজেলার ২৫ হাজার জন কৃষককে ২ কোটি ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৯০০ টাকার সার ও বীজ সহায়তা দিচ্ছেন সরকার। একই সঙ্গে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় রবি মৌসুমের জন্য সার এবং ৭ প্রকার বীজের জন্য ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জেলার ৯ উপজেলার ২১ হাজার ৪০০ জন কৃষক এসব সহায়তা পাবেন। রাজশাহীতে সার ও বীজ সহায়তা পাবে ২৫ হাজার কৃষক। খুব শিগগিরই জমি থেকে পানি কমে যাবে এবং জমি চাষাবাদের জন্য প্রস্তুত হবে। যার জন্য প্রণোদনা উপকরণ কৃষকের আর্থিক সংকটে সহায়তা হবে।

এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, প্রণোদনা প্যাকেজের কোনোটাই কোনো অনুদান নয়। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণ দেবে এবং ঋণের সুদের কিছু অংশ সরকার বহন করবে এবং বাকিটা ওই গ্রাহককে দিতে হবে। সরকার যে কিছু সুদ বহন করবে যা প্রণোদনা প্যাকেজের মূল বৈশিষ্ট্য। রাজশাহীতে কৃষি ঋণ বিতরণের গতি বেড়েছে। ব্যাংকগুলো প্রণোদনা ঋণে খামারিদের আগ্রহ করার বিপরীতে অনুৎসাহিত করছেন। খামারিরা ঋণ গ্রহণে আগ্রহ থাকলেও তাতে ভাটা পড়েছে। ব্যাংকগুলো অলিখিত নানা শর্ত জুড়ে বিব্রত ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ ছিল। সেইসাথে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষমতা দেখা দিতে পারে এমন ভয়ে নাজেহাল ও ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা সরকারি ঋণ পাইনি বলে অভিযোগ অধিকাংশ পোল্ট্রি খামারিদের। রাজশাহী পোল্ট্রি এ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক বলেন, প্রণোদনার যে টাকা দেয়া হবে সেটাই সামান্য, ৮-১০ হাজার টাকা। ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় খামারিদের ৮-১০ লাখ টাকা করে ঋণের ব্যবস্থা করা সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা জামিল হোসেন বলেন, শুরুতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ ছিল ১০ শতাংশ এবং বর্তমানে ৫৫ শতাংশেরও বেশি। গত জুলাই- আগস্ট ২ মাসে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রদান করা হয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কিছুটা শিথিল করা হচ্ছে। যাতে তারা সহজেই এ ঋণ নিতে পারে। ঋণ নিতে কোন জটিলতা নেই। ১০-১৫ বছর আগে হয়ত কিছু বিষয়ে জটিলতা ছিল। তবে যোগ্যরাই ঋণ পেয়েছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে পোল্ট্রি খামরি, ডেইরি, ফসলসহ কৃষি প্রণোদনা খাতের ঋণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। প্রণোদনা ঋণের বিষয়ে উপযুক্তদের প্রত্যেককে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের ৩৮৩ টি শাখায় থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়।

জেলার কৃষকদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সঠিক ভাবে ঋণ গ্রহীতাদের সেভাবে সহযোগিতা করা হয়নি, বরং ঋণ গ্রহণে অনুৎসাহিত করা হয়েছিল। ঋণ পাওয়ার যোগ্যতায় রয়েছে ফুল, ফল, শস্য, মাছ, হাঁস, মুরগি, দুগ্ধ খামার এবং প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের সাথে জড়িত গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ও খামারিদের। করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতিতে কৃষক, খামারির ক্ষতি পোষাতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা ঋণ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ কৃষক ও খামারিরা ব্যাংক থেকে বিশেষ প্রণোদনার এ ঋণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছিল। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অসহযোগিতামূলক আচরণ, ঋণের টাকা পরিশোধের নিশ্চিয়তায় দলিল ও জামানত জমা রাখাসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের।